| |

শেয়ালের মাংস ও শেয়ালের কথা

প্রকাশঃ জুন ০২, ২০২২ | ৬:২৮ অপরাহ্ণ


চিররঞ্জন সরকার : চালাক, চতুর ও ধূর্ত প্রাণী হিসেবে শেয়ালের একটা আলাদা খ্যাতি আছে। কিন্তু তা হলে কী হবে, মানুষ শেয়ালের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি চালাক। তাই তো শেয়াল মানুষের মাংস না খেলেও মানুষ কিন্তু ঠিকই শেয়ালের মাংস খায়। শেয়ালের মাংস খেতে গিয়ে বিভিন্ন সংকটের সম্মুখীন হতে হয়।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় শিয়ালের মাংস বিক্রির অপরাধে দ-প্রাপ্ত রঞ্জিত চন্দ্র দাস (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ২৩ মে উপজেলার আলেকজান্ডার বাজারে অভিযান চালিয়ে এ দ-াদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম শান্তনু চৌধুরী।

রঞ্জিত নাকি প্রায়ই শিয়ালের মাংস বিক্রি করতেন। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ফাঁদ পেতে তিনি শেয়াল আটক করতেন। এরপর জবাই করে মাংস বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতেন। বিভিন্ন সময় অভিযোগ পেলেও তাকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। এবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শিয়ালের মাংস বিক্রিকালে তাকে আলেকজান্ডার বাজার থেকে আটক করা হয়। এ সময় শিয়ালের চামড়াসহ ছয় কেজি মাংস উদ্ধার করা হয়েছে। পরে মাংসগুলো গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। তাকে পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী সাজা দেওয়া হয়েছে।

দুনিয়ার এত কিছু থাকতে কেন শেয়ালের মাংস খেতে হবে, সেটা এক বিস্ময়। তবে আমাদের দেশে কিছু মানুষের মধ্যে বিশ্বাস আছে যে, বাত-ব্যথা কিংবা কঠিন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে শিয়ালের মাংস রান্না করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। এই বিশ্বাসের কারণে একশ্রেণির মানুষ সুযোগ পেলেই শেয়াল ধরে মাংস বিক্রি করেন। এর ক্রেতারও অভাব হয় না।

শেয়ালের মাংস খেলে আদৌ কোনো উপকার হয় কি না, সেটা নিয়ে সংশয় থাকলেও এই প্রাণীটি ধরা যে অত্যন্ত কঠিন কাজ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ছোটখাটো এই প্রাণীটি অত্যন্ত সজাগ ও চতুর। তাদের লম্বা এবং শক্তিশালী পা আছে। ফলে তারা খুব দ্রুত দৌড়াতে ও শিকার ধরতে পারে এবং তাদের শিকারিদের খপ্পর থেকে পালাতে পারে।

শেয়ালের চেয়ে বিস্ময়কর অঙ্গ হচ্ছে তার লেজ। সব শেয়ালেরই একটি তুলতুলে লম্বা লেজ আছে। এটি কেবল জন্তুটির শোভা বাড়ায় না, বরং একটি দরকারি বেঁচে থাকার সরঞ্জাম হিসেবেও কাজ করে। এটি তার দৌড়ানোর সময় আরো বেশি গতি ও ভারসাম্য দেয়। একটি কার্যকর রাডার হিসাবেও কাজ করে। যখন একটি শিকারি কুকুর তাকে তাড়া করে এবং ধরতে উদ্যত হয়, তখন তুলতুলে লেজটি বাঁ দিকে ঝাঁকুনি দেয় (কুকুররা এটির পেছনে ছুটে আসে) এবং শেয়াল বিপরীত দিকে চলে যায়। বনের প্রায় সব প্রাণীকে সহজে ঘায়েল করতে পারলেও শেয়ালের লেজের এই ম্যাজিকের সঙ্গে কুকুর প্রায়শই পেরে ওঠে না।

শেয়ালের এই ধন্বন্তরি লেজের ডগা সাদা হয়। এটাও তাদের কাজে লাগে। শেয়ালকে তার শাবকদের প্রতিনিয়ত নজরদারিতে রাখে। ঝোপঝাড়-পাতার মধ্যে বাচ্চারা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য শেয়াল এই সাদা নিশান ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। লেজের এই সাদা অংশ দেখেই ছানারা মা শেয়ালকে খুঁজে বের করে।

এই লেজে, শেয়াল বৃষ্টির দিনের জন্য কিছু পুষ্টি সঞ্চয় করে। এই তুলতুলে অঙ্গটিকে তারা কম্বল হিসেবেও ব্যবহার করে। যখন ঘুমায় তখন এটি একটি বালিশ হিসাবে ব্যবহার করে। ঠান্ডা আবহাওয়ায়, শেয়াল তার লেজ দিয়ে নাক বা শাবক ঢেকে রাখে। এই লেজ দিয়ে এমনকি সে যোগাযোগও করতে পারে! লেজ যখন উত্তোলিত হয়, এটি তার শক্তি, অঞ্চল, সার্বভৌমত্ব, শিকারকে রক্ষা করার ইচ্ছা প্রদর্শন করে।

তার নিজস্ব প্রজাতির সঙ্গে এবং শরীরের কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকা পোকামাকড় তাড়ানোর জন্যও লেজ ব্যবহার করে। শেয়ালের লেজের গোড়ায় একটি মোটামুটি বড় গ্রম্হি রয়েছে, যা ফুলের ঘ্রাণ উৎপন্ন করে। এটা নিখুঁত ছদ্মবেশ! শেয়ালের নিজস্ব গন্ধ লুকিয়ে রাখার কৌশল। তার পায়ের রেখাও সে মিশিয়ে দেয় লেজের সাহায্যে। লেজ সেক্ষেত্রে ল্যাডার বা মইয়ের ভূমিকা পালন করে। সেজন্য শেয়ালের কাছে লেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লেজটিকে সে সব সময় আড়ালে রাখতে চায়। লেজে কোনো ধরনের জখম বা আঁচড় যেন না পড়ে সেজন্য সর্বাত্মক সচেতন থাকে।

পৃথিবীতে বহু প্রজাতির শেয়াল দেখা যায়। যেমন :পাতিশেয়াল, খেঁকশেয়াল, লাল শেয়াল, ধূসর শেয়াল প্রভৃতি। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় খেঁকশেয়াল। এরা শেয়াল প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

শেয়াল নিশাচর। তবে পেটে ক্ষুধা থাকলে দিনের বেলায়ও বের হয়। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝোঁপের ভেতর, মাটির গর্তে লুকিয়ে পড়ে। এরা সাধারণত মাংসাশী প্রাণী। প্রধান খাবার পোকামাকড়, পাখি, ছোট আকারের মেরুদ-ী প্রাণী, টিকটিকি, মৃতদেহ, শাকসবজি, আখের রস, ভুট্টা ইত্যাদি। খাবারের অভাব দেখা দিলে লোকালয়ে হানা দেয়। হাঁস-মুরগি ধরে খায়। বেশির ভাগ প্রজাতির শেয়াল সাধারণত দৈনিক এক কিলোগ্রাম খাবার গ্রহণ করে। এরা গড়ে চার-পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১১টি বাচ্চা প্রসব করে থাকে। শিয়ালের গড় আয়ু দুই থেকে পাঁচ বছর। তবে বন্য পরিবেশে শেয়াল সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এটা ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। শিকার আর বিপদ দেখলে এরা একসঙ্গে ডেকে ওঠে। অপরিসীম ধৈর্যের কারণে এটা সাধারণত শিকার মিস করে না।
সেই প্রাচীনকাল থেকে মানুষ নানাভাবে শেয়ালকে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। ঈশপের গল্পে শেয়াল ধূর্ত, চালাক, পঞ্চতন্ত্রে হিংস্র ও কুবুদ্ধিদাতা, লোককাহিনিতে ধূর্ত, বুদ্ধিদাতা ও লোভী। ‘সব শেয়ালের এক রা’ হলেও বিশ্বের কোনো প্রান্তের মানুষ শেয়ালকে অভিন্নভাবে অনুভব করেনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিবাশোধন কমিটি’ গল্পে শোধনের পর শেয়ালের নাম রাখেন খাসালেজুরি ও সুকোমল লাঙ্গুলী। অথচ জীবনানন্দ দাশ ‘সেই সব শেয়ালেরা’ কবিতায় শেয়ালকে হতমান ও পঙ্গু মানুষের প্রতীক বানিয়েছেন।
সংস্কৃত শৃগাল শব্দ থেকে বাংলায় শিয়াল শব্দটি এসেছে। শেয়াল তার কথ্য বা চলিত রূপ। আর সংস্কৃত ‘শৃজ’ ধাতু থেকে আসা শৃগাল শব্দটি মহাভারত ও মনুসংহিতায় রয়েছে।

শেয়লের ‘শিবা’ নামটি রয়েছে ঋ™েঙ্কদে। এটা নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ হলেও বাংলায় তা পুংলিঙ্গ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। শিবা মানে ‘যে শুয়ে ডাকে’। আবার রাতের বেলা এটা অনেকটা প্রহরীর মতো যাম বা প্রহর ঘোষণা করে বলে এটা ‘যামঘোষ’ নামেও পরিচিত।

মাংশাসী শেয়াল আবার জাম প্রেমিক। জাম পাকলে এটাকে জামগাছের তলায় ঘুরঘুর করতে দেখা যায় বলে এটাকে জম্বুকও বলা হয়। আবার কোনো কারণে এটা ক্রুদ্ধ বা ব্যর্থ হলে ‘ফে ফে’ শব্দ করে বলে এটাকে ‘ফেরব’ বলা হয়।

এর ডাক বহুদূর থেকে শোনা যায় বলে এটা ‘ক্রোষ্টা’, কান দুটি শিংয়ের মতো খাড়া বলে ‘শম্বুকর্ণ’ আর প্রায়ই হাড়মাংস মুখে নিয়ে এটাকে দৌড়াতে দেখা যায় বলে এটা ‘ক্রব্যমুখ’।
শেয়াল সম্পর্কে জনপ্রিয় উক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে :‘শেয়াল নেকড়ের চেয়ে বেশি সন্তুষ্ট জীবন যাপন করে’, ‘শেয়াল ঘুমের মধ্যে মুরগি গোনে,’ ‘একটি বুড়ো শেয়ালকে দুবার বোকা বানানো যায় না,’ ‘শেয়াল ধূসর হতে পারে, কিন্তু সে কখনই ভালো হতে পারে না,’ ‘শেয়ালের চেয়ে ধূর্ত কোনো জানোয়ার নেই,’ ‘খরগোশ শেয়ালের বন্ধু নয়, খাবার’, ‘শেয়াল অনেক কিছু জানে, কিন্তু যে তাকে ধরে সে বেশি জানে,’ ‘সিংহের শক্তি শেয়ালকে মানায় না, শেয়ালের ধূর্ততা সিংহের পক্ষে শোভা পায় না’, ‘শেয়াল মুরগির রক্ষক হয় না, ‘শিয়ালের এক শত রূপকথা আছে এবং সেগুলি সবই মুরগির কথা,’ ‘প্রতিটি শেয়াল তার লেজের প্রশংসা করে।’

আসলে ‘চতুর’, ‘ধূর্ত’, ‘চালাক’, ‘লোভী’ ইত্যাদি বিশেষণ মানুষই শেয়ালের ওপর আরোপ করেছে। শেয়াল কি আদৌ তেমন? আমরা মানুষেরা কি শেয়ালের চেয়ে উত্তম? মানুষের চেয়ে ধূর্ত, লোভী, হিংস্র, চতুর প্রাণী কি পৃথিবীতে আর অন্যটি আছে?
পরিশেষে শেয়ালের ‘ভালোমানুষি’ বিষয়ে একটি প্রচলিত গল্প দিয়ে শেষ করা যাক।

একটা গাধা এবং একটি শেয়াল বনের মধ্যে ঝগড়া শুরু করল।
গাধা বলল, ঘাস হলুদ!
শেয়াল বলল, না, ঘাস সবুজ!
যখন এই বিতর্ক চরম আকার ধারণ করল তখন তারা বিচারের জন্য বনের রাজা সিংহের কাছে গেল। সব শুনে সিংহ শেয়ালকে এক মাসের সশ্রম কারাদ- দিল।

এমন বিচারে শেয়াল অসন্তুষ্ট হয়ে সিংহকে প্রশ্ন করল, এটা কি ন্যায়বিচার হলো? ঘাস কি সবুজ নয়?
সিংহ উত্তর দিল, ঘাস অবশ্যই সবুজ। কিন্তু আমি তোকে দ- দিয়েছি, তুই গাধার সঙ্গে তর্ক করেছিস বলে!
কাজেই, কার সঙ্গে তর্ক করবেন, কতটুকু করবেন, সে ব্যাপারে সাবধান!

লেখক : রম্যরচয়িতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্রেকিংঃ